এডগার কেরেট — ইসরাইলের কাফকা

STORY AND ARTICLE:

এটগার কেরেট —— ‘ইসরায়েলের কাফকা’
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
সৌম্য ঘোষ
“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””
পরাবাস্তব সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম এটগার কেরেট। তাঁকে ‘ইসরায়েলের কাফকা’ নামেও অভিহিত করা হয়। ছোট গল্প, গ্রাফিক নভেল এবং চিত্রনাট্যের জন্য তুমুল জনপ্রিয় এই লেখকের লেখার বিষয়বস্তু পরাবাস্তববাদ। দৈনন্দিন জীবনের নানা ঘটনাকে পরাবাস্তববাদে রূপ দিয়ে ফুটিয়ে তোলেন গভীর জীবনবোধের কথা। সহজ, সাবলীল আর প্রচলিত ভাষায় লেখা তাঁর ছোট কলেবরের গল্পগুলো বিশ্বব্যাপী তুমুল জনপ্রিয়। পরিমিত শব্দসংখ্যা, অনন্য পরাবাস্তববাদ, সাবলীল আর প্রাঞ্জল ভাষা, সহজ শব্দচয়ন এবং সুন্দর বাক্যগঠনের মধ্য দিয়ে এটগার কেরেট বিশাল কলেবরের একটা গল্পই লেখেন নিজস্ব ঢঙে, নিজস্ব স্টাইলে; তাও একদম স্বল্প পরিসরে। আর তাই পিপলের কাইল স্মিথ এটগার কেরেট সম্পর্কে বলেন, 

“অন্য লেখকেরা ৬০০ পৃষ্ঠায় যা করতে পারেন, কেরেট ৬টা অনুচ্ছেদেই তার চেয়ে বেশি করতে সক্ষম…!”

কেরেটের গল্পে স্বর্গের দূতেরা আকাশ থেকে নেমে আসে এক মধ্যদুপুরে। মিশে যায় সাধারণ মানুষের সঙ্গে। মাঝরাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে ফিশবোল থেকে নেমে আসে গোল্ডফিশ, বাড়ির কর্তার চটি পরে হেঁটে বেড়ায় সারা বাড়িঘর। পয়সা পেটে রাখতে রাখতে জীবন্ত হয়ে ওঠে এক বালকের মাটির ব্যাংক। প্রেয়সীর চুম্বনে যেন গ্লু’র চেয়ে শক্ত কোনো আঠায় ঝুলে থাকে প্রেমিক আজীবন। নতুন রূপে পাঠক বিচ্ছেদ আর ভালোবাসার সংজ্ঞা পায়। মনস্তাত্ত্বিক দর্শন, গভীর জীবনবোধ, দৈনন্দিন জীবনের গল্পের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপরিচিত এক জগতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে পাঠকের। 

ইসরায়েলের ভাষায় কেরেট অর্থ শহর এবং এটগার অর্থ চ্যালেঞ্জ (মায়ের গর্ভে ছয় মাস কঠিন গর্ভাবস্থায় থাকার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে সিজারিয়ান করে তাঁর জন্ম হয়)। তিনি নিজেই নিজেকে ‘আরবান চ্যালেঞ্জ’ বা ‘শহুরে চ্যালেঞ্জ’ বলে ব্যঙ্গ করে থাকেন। কেরেটের জন্ম ১৯৬৭ সালের সিক্স-ডে ওয়ার বা জুন ওয়ার নামে পরিচিত আরব-ইসরায়েলের যুদ্ধ চলাকালে। তাঁর শৈশব এবং বেড়ে ওঠা রামাতগান নামক শিল্পকেন্দ্রের শহরে; পরবর্তীকালে ১৯৯১ সালে ইরাক এখানে তাদের স্কাড মিসাইল হামলা করে। 

কেরেট তাঁর বাবা-মায়ের তৃতীয় সন্তান। ইসরায়েলে জন্ম নেয়া প্রতিটি নাগরিকের জন্যই বাধ্যতামূলকভাবে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীতে কাজ করতে হয় বছর দুয়েক। আর সেই সুবাদেই কেরেটও সামরিক বাহিনীতে যোগ দেন। পুরোনো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক আশ্রয়কেন্দ্রের কম্পিউটারের সামনে তাঁকে ৪৮ ঘণ্টা টানা কাজ করতে হতো। সেখান থেকেই মূলতঃ তাঁর লেখালেখির যাত্রা শুরু। এমন একটা জায়গায় কেরেটকে রাখা হতো, যেখান থেকে বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তাই কেরেট কল্পনার আশ্রয় নিতেন। সেই কল্পনাই পরাবাস্তবতার রূপে ফিরে আসে তাঁর লেখায়। 

তাঁর লেখা প্রথম গল্প পাইপস; যে গল্পটা ১৯৯২ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্পসংকলন ‘পাইপলাইন’-এ ছিল। গল্পটা এক নিঃসঙ্গ ব্যক্তির; যে কি না একটা পাইপের ফ্যাক্টরিতে কাজ করে। বিশ্বের কারো সাথেই তাঁর যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই। এক রাতে আচমকা লোকটা অনেক প্যাঁচওয়ালা একটা জটিল পাইপ বানায়, যার মধ্য দিয়ে মার্বেল ছাড়া মাত্রই তা অদৃশ্য হয়ে যায়। লোকটা তখন চিন্তা করে, যদি এত বিশাল একটা পাইপ বানানো যায়, যেটা দিয়ে সে নিজে অদৃশ্য হতে পারবে!
সেই পাইপের গল্প এটগার কেরেটকে ইসরায়েলের তরুণ প্রজন্মের কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে এবং পরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এনে দেয় তাঁকে। তাঁর লেখা রচনা প্রকাশ পেয়েছে বিশ্বখ্যাত সব পত্রিকায়, যেমন- দ্য গার্ডিয়ান, দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য নিউ ইয়র্কার, দ্য প্যারিস রিভিউ, লে ম্যোন্ডে এবং জোয়েট্রাপ। তাঁর লেখা ছোট গল্পের উপর ভিত্তি করে ৪০টিরও অধিক শর্টফিল্ম নির্মাণ করা হয়েছে, যার মধ্যে একটি আমেরিকান এম টিভি পুরস্কার জিতেছে। তাঁর উপন্যাসের উপর ভিত্তি করে ২০০৬ সালে নির্মাণ করা হয় সিনেমা ‘রিস্টকাটার্স: অ্যা লাভ স্টোরি’, যা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক প্রশংসা পায়। 

তাঁর প্রাপ্তির ঝুলিতে আছে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অসংখ্য পুরস্কার; যার মধ্যে বুক পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্ল্যাটিনাম পুরস্কার, প্রধানমন্ত্রীর পুরস্কার, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সিনেমা পুরস্কার, জিউশ কোয়াটার্লি উইনগেট পুরস্কার, সেন্ট পিটার্সবার্গ পাবলিক লাইব্রেরির সেরা বিদেশি ভাষার প্রিয় লেখক পুরস্কার এবং দ্য নিউমান পুরস্কার অন্যতম। ২০০৭ সালে এটগার কেরেট এবং তাঁর স্ত্রী শিরা গেফেন তাঁদের চলচ্চিত্র জেলিফিশ-এর জন্য কান ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের ক্যামেরা ডি’অর বা গোল্ডেন ক্যামেরা পুরস্কার পান। 

এছাড়া, তাঁরা ফরাসি শিল্পী ও লেখক গিল্ডের সেরা পরিচালকের পুরস্কার গ্রহণ করেন। ২০১০ সালে কেরেটকে ফ্রান্সের মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ফরাসি শেভালিয়ার ডেস আর্টস অ্যাট ডেস লেট্রেস ডেকোরেশনে ভূষিত করা হয়। ও’কনর শর্ট স্টোরি অ্যাওয়ার্ডে দুবার ফাইনালিস্ট হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন এই গুনী লেখক। আর অতি সাম্প্রতিককালে, চার্লস ব্রোনফম্যান পুরস্কার এবং আদেই উইজো পুরস্কার পেয়েছেন কেরেট। কেরেটের বই বিশ্বের ৪৫টি দেশে ৪২টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। 

বর্তমানে তিনি ইসরায়েলের রাজধানী তেল আবিবে বসবাস করেন। অধ্যাপনা করছেন নেগেভের বেন-গুড়িয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে। এছাড়া, তেল আভিভ বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম স্কুলের অধ্যাপক হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। তাঁর সিনেমা ‘স্কিন ডিপ’ ইসরায়েলের অস্কার পুরস্কার জিতেছে এবং আন্তর্জাতিক প্রাঙ্গণে বেশ কয়েকটি ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সম্মানিত হয়েছে।

ইসরায়েলের বিখ্যাত পত্রিকা ইয়েডিওথ আহরোনোথ তাঁর ‘দ্য মিসিং কিসিঞ্জার’ নামক বইটিকে ইসরায়েলি সাহিত্যের সেরা পঞ্চাশটির বইয়ের তালিকায় স্থান দিয়েছে। কেরেটের প্রতিটি বই-ই বেস্টসেলার খেতাবপ্রাপ্ত এবং ৪০ হাজারের অধিক কপি বিক্রিত হয় বলে বেশ কয়েকবার বুক পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্লাটিনাম পুরস্কার জিতেছেন। ফ্রান্সের এক জরিপে দশকের সেরা ২০০টি বইয়ের তালিকায় কেরেটের ‘নেলার্স হ্যাপি ক্যাম্পার্স’ বইটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। 

এটগার কেরেট বর্তমানে তেল আবিবের স্থায়ী বাসিন্দা হলেও প্রায় সময়ই তিনি পোল্যান্ডের ওয়ারশ তে যান। কারণ, ওখানে আছে তাঁর আরেকটি বাড়ি; যেটিকে বাড়ি না বলে শিল্পস্থাপনাই বলা ভালো। কেরেট হাউজনামের এই বাড়ি দুটি বহুতল ভবনের মধ্যকার ৫ ফুটের মতো ফাঁকা অংশে নির্মিত। আর তাই এই বাড়িটি পৃথিবীর সবচেয়ে পাতলা বা চিকন বাড়ি বলে স্বীকৃতি পেয়েছে। বাড়িটি নির্মাণ করেছেন পোলিশ স্থপতি ইয়াকুব চেসনি।

পোলিশ আইন অনুযায়ী, এ স্থাপনা বসবাসের অযোগ্য তাই, একে বেশিরভাগ সময় শিল্পস্থাপনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়; তবে এটগার কেরেট মাঝেমধ্যেই এখানে আসেন, লেখালেখি করেন, কিছুটা সময় একাকিত্বে কাটান। তাঁর মতে, এই বাসায় থাকা আর টিনের কৌটায় একটা সার্ডিন মাছের জীবন- একই কথা।

_______________________________
লিখেছেন … অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ।
চুঁচুড়া। হুগলী।
_______________________________

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top