প্রিয় মা, এই যাপিত জীবনে

মা

প্রিয় মা,
এই যাপিত জীবনে বুকের ভিতর চাপা রাখা এক অপ্রকাশিত অভিমানের নাম-আপনি।আপনি আমার প্রিয় কেউ নয়,না ছিলেন কখনো।অবুঝের তিনটা বছর হয়তো আপনার বুকে-কোলে ছিলাম।ব্যস সেটুকুই।একটা স্মৃতির টুকরো খন্ড।এরপর জীবনের কোথাও বিন্দু হয়েও জুড়ে ছিলেন না।শুধু মাত্র চিঠিতে প্রিয় সম্বোধনটা রাখতে হয়-বলে রাখা।নিতান্ত ভদ্রতা!

যে আমার আপনার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য পাগল হবার কথা ছিলো।কিংবা কথা ছিলো আপনার মাতৃগর্ভে প্রতিটি নিঃশ্বাসে বেড়ে উঠা এই আমি আপনার ভালোবাসায় বড় হবো।সে সকল কোমল ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করে আমার সুন্দর শৈশবটাকে গলা টিপে হত্যা করেছেন-আপনি।আজ সেই আমি-ই আপনার ভালোবাসা পেয়েও উপেক্ষা করে ঠেলে দিচ্ছি ঘৃনায়।সে ভালোবাসা আজ অতি তুচ্ছ-লোক দেখানো!মনে হচ্ছে ভীষণ রকম সস্তা।এই উড়ু ভালোবাসার কাঙ্গাল অন্তত আমি নই।

আপনারা তো ঠিকই আপনাদের মতো করে আলাদা আলাদা সংসার পেতে নিয়েছেন নিজেদের ইচ্ছেতেই। অথচ আমি এই কপালপোড়া,আপনাদের কোনো সংসারেই জায়গা হলো না।না আপনার কাছে,না বাবার কাছে।আপনাদের আলাদা সংসারে নতুন করে চাঁদ হলো।আমি এই কালাচাঁন তলিয়ে গেছি অমাবস্যার কালো অন্ধকারে।

আমি আমার এইটুকু জীবনে সবচেয়ে ভালোবাসার দু’টো মানুষকে প্রচণ্ড রকম ঘৃনা করে আসছি!আর?আর ঘৃনা করি আপনাদের মাঝে ঢুকে পড়া সেই তৃতীয় মানুষটাকে।যাপিত জীবনে এই তিনটা মানুষকে আমি কখনোই ক্ষমা করবো না।

দাদির দেওয়া ঠিকানা মতো গিয়েছিলাম নানাবাড়ী।দাদি মারা যাওয়ার আগে খুব ইচ্ছে ছিলো আমাকে নিয়ে আপনার কাছে আসার কিন্তু তার শেষ ইচ্ছেটা আর পূরণ হয়ে উঠেনি।এক শীতের মধ্যরাতে নিশ্চুপ হয়ে গিয়েছিলো।এই মানুষটা আপনাকে অনেক ভালোবাসতো-বুঝতাম আমি!দাদির শেষের দিনগুলাতে কাছে থাকার সৌভাগ্য হয়েছিলো আমার।বেঁচে থাকার শেষ অব্দি তার চোখের সীমানায় খুঁজেছেন আমায়।হয়তো বুঝে গিয়েছিলো তার চলে যাওয়ার সময় হয়ে গেছে। বুঝতে পারছিলেন সে চলে যাবার পর এই “কালাচাঁন” নাতিটার কেউ-ই থাকবে না।

দাদির মৃত্যুর আগের দিন ঠিক বিকেলে আছরের আজান দিয়েছে সবে।সবাই ওযু করতে বাহিরে,আমি আর ছোট ফুফু দাদির কঙ্কালসার দেহের মাথার কাছে দুপাশে বসে ইয়াছিন সূরার শেষের তিন আয়াত তেলোয়াত করছিলাম।হঠাৎ যেনো মনে হলো-দাদি দুজনকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন।ফুফু আর আমি দাদির কোল ঘেঁষে দাদির হাতগুলো ধরে বসলাম।ফুফু আস্তে করে বলল, কি মা!তোমার কিছু লাগবে?দাদি তখন দুজনের হাত একসাথে জুড়ে দিয়ে ফুফুর দিকে তাকি রইলেন।ফুফু নিঃশব্দে চোখের পানি লুকাতে ব্যস্ত।ঠিক তখন আমার দিকে তাকিয়ে একটু শুকনো হাসি দিয়ে বুঝাতে চাইলেন-তোর জন্য একটা মানুষ রেখে গেলাম।ততক্ষনে আমার চোখের পানি গাল বেয়ে থুতনির নিচে জমা হয়েছে।কোনো শব্দ নেই এখানে।তিনটা মানুষ এখানে চোখে চোখে কত কথার সাক্ষী হয়ে গেলো কেউই জানলো না।দাদির চোখে চোখ রেখে কথা দেয়ার দায়িত্ব এখনো পালন করে ফুফু।

আপনার ১৪ বছরের ছেলেটা আমায় ফোন করে মাঝে মাঝে।ও নাকি আমার জন্য খুব পাগল!মামার কাছ থেকে শুনেছি,অবশ্য!খুব সুন্দর করে ভাইয়া বলে ডাকে আমায়।আপনার মাতৃগর্ভে আমার জন্ম হয়েছিলো।তাই হয়তো এ ছোট ভাইটা আমার মাঝে একটা আপন আপন গন্ধ খুঁজে পায়।একদিন আমি গিয়েছিলাম ওর স্কুলে-তখন ও ক্লাস ফোরে পড়ে। দেখেই চিনে ফেলেছি।আমার ছেলেবেলার চেহারাটা অবিকল যেন ওর মুখের মধ্যে বসানো।তাই বুঝি আমায় ভুলতে পেরেছেন।তাই বুঝি আমায় মনেও পড়েনি কখনো,এই মুখপানে চেয়ে বুঝি ভুলে গিয়েছিলেন আমিও যে ছিলাম একটা সন্তান,আপনার অতীতে ফেলে আসা-সংসারে।

সেদিন খুব বৃষ্টি ছিলো যেদিন আমি আপনার সাথে দেখা করতে যাবো।মামাকে ফোনে কথা দেওয়া ছিলো।সব উপেক্ষা করেই বাস থেকে নেমে সিএনজি করে বঙ্গারবাজার আসলাম।এখান থেকে ২০ টাকা ভাড়া খাগকান্দা মেঘনা ঘাটে যেতে।এ রাস্তাগুলো সাথে আমার কোনো জানাশোনা নেই,তবুও যেন মনে হলো কত পরিচিত সব।সে রাস্তায় ছুটে চলছে আমাকে বহনকারী রিক্সা-আপন মনে।আর ঝিরঝির বৃষ্টির ফোটায় চশমার কাচ ঘোলা হয়ে যাচ্ছে।চোখ থেকে নামিয়ে পাঞ্জাবীর পকেটে রেখে দিলাম।ঝাপসা চোখে বোঝা যাচ্ছে রাস্তার দু’পাশের সারিসারি গাছগুলা আমার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।কাছের মানুষরাও কি সরে যায়?এভাবে!

আকাশটার দিকে তাকালাম।একটা চিল তার দু’পাশের পাখা মেলে দিয়ে এই বৃষ্টি ফোটার মাঝেও উড়ে চলছে আপন মনে একই ধীরস্থির সাবলীল গতিতে।সাথের সঙ্গীরা হয়তো নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।তাকে হয়তো কেউ ডাকে-নি,হয়তো এমন কেউ ছিলো না সাথে যাবার।এ পথ শুধু তার একার। মানুষও কি এমন একা হয়?”এই মামা লন নামেন,এইবার আমরা ঘাটলায় আইসা পরছি”!
হঠাৎই রিক্সাওয়ালা মামার কথায় হুশ ফিরলো।

তীরে দাঁড়িয়ে আছি ঝিরঝির বৃষ্টি আপাতত থেমে গেছে।সাথে আরো অনেকেই!তাদের সবারই যাওয়ার গন্তব্য-ঐপাড়ে।একটা বাচ্চা তার বাবার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে,পায়ে ব্যান্ডেজ-মনে হলো-এক্সিডেন্ট হয়েছিলো!সদরহসপিটাল থেকে ফিরছে বাচ্চাটা!সমানে বলে যাচ্ছে মার কাছে যাবো আমি,মার কাছে যাবো।আম গাছটার নিচে এক হুজুর দম্পতি দাঁড়িয়ে আছে,হুজুরের স্ত্রীর কোলে ছোট বাবু বয়স সাত-আট মাস হবে।বাবুটা কোলে থেকেই মার মুখের উপরে থাকা নেকাবটা সড়ানোর চেষ্টা করছে।মহিলা নেকাব সরিয়ে বাবুর গালে একটা চুমু এঁকে দিয়েছে।বাবু শান্ত এখন।পেছন থেকে এক মহিলা কাছে এসে বলল,ভাইজান বাচ্চাটারে একটু ধরবেন?পোলাডা পানির জন্য কান্না করতেছে।দোকান থেকে পানির একটা বোতল নিয়েই চলে আসমু।বাচ্চাটার হাত ধরে নিচু হয়ে বসে জিজ্ঞেস করলাম নাম কি তোমার বাবু, বাচ্চাটা এক গাল হেসে দিয়ে বলল,আমার নামই তো বাবু।আমিও ফিক করে হেসে দিলাম বাচ্চার এমন সাবলীল কথা শুনে।

সবাই উঠে পড়েছে ট্রলারে।প্রতিটা টা মানুষের ভিন্ন ভিন্ন গল্প।রোজ কত গল্প ট্রলার তার বুকে ভর করে নিয়ে যায় এপাড় থেকে ওপাড়ে।কিংবা ওপাড় থেকে ওপাড়ে।এমন একটা গল্প তো আমরো হতে পারতো।আমি এক মনে আকাশের দিকে তাকাই।ট্রলার তার নিজস্ব শব্দ করে এগিয়ে চলে।

ট্রলার তীরে এসে ভিড়েছে।সবাই এক এক করে নামছে।ট্রলার উঁচু হওয়ায় ট্রলার থেকে নামার জন্য এখানে এক ধরনের কাঠের সিঁড়ি ব্যবহার করা হয়,সেটা দিয়েই সবার নামতে হয়।সেই বাচ্চাটার হাতে পানির বোতল এখনো আছে,ভয় পাচ্ছে নামতে,বাচ্চার মা এক হাত ধরে নেমে যাচ্ছে,কি সুন্দরস সে দৃশ্য।বিকেলের সোনারোদ নদীর পানিতে বিকশিত হয়ে মা আর ছেলের মুখে পড়ছে,এ সৌন্দর্যসৃষ্টির কোনো বিবরণ হয় না।এমন সৌন্দর্য কাছ থেকে দেখতে হয়।এক-এক করে যার যার গন্তব্যে চলে যাচ্ছে সবাই। ট্রলারের মাঝি বলল,ও মিয়া ভাই আপনি নামবেন না?আমি সবার পরে নামলাম। আমাকে এখান থেকে যেতে হবে রাধানগর বাজারে।ওখান থেকে পাঁচ মিনিট হাটলেই ব্যস।তার পরই আপনার সাথে দেখা হবে আমার। আপনার ফেলে আসা সংসারের একটা নাড়ীছেঁড়া ধন।

আমি কেনো কাঁদবো না বলো?তুমি ছাড়া কে ছিলো আমার।মায়ের মতন কি কেউ হয়?সবার কৃত্রিম ভালোবাসায় বড় হতে হতে একসময় চারপাশের এ মানুষগুলোকেই ভালোবাসতে শিখে গেছি।তোমার চেহারাও আমার চোখে ভাসে না।স্কুলে বৃষ্টির দিনগুলোতে সবার মায়েরা এসে তাদের সন্তানদের ছাতা দিয়ে এসে নিয়ে যেতো।আমি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতাম,কখন বৃষ্টি থামবে।বৃষ্টিরা থামে না।
আমি স্থির পায়ে হাঁটা ধরতাম।আমার সব বইখাতা ভিজিয়ে দিয়ে চলে যায়-বৃষ্টিরা।বাসায় গিয়ে সবার বকা শুনি।বৃষ্টিতে ভিজেই কেন আসলাম?কাকু তো এক ঘা দিয়েই বসে।আমি নিশ্চুপ,জানালা দিয়ে দূরের ঐ আকাশের দিকে তাকাই,যে কিছুক্ষণ আগেই তার গায়ের যত দুঃখ ছিলো ঝেড়ে দিয়েছে পৃথিবীতে বৃষ্টির ফোটায়।আমি কেন পারি না?

হঠাৎই ফোন বেজে উঠলো।সকাল থেকেই আকাশে মেঘ আজ।আবার মেঘ জমেছে যে কোনো সময় ঝরে পড়তে পাড়ে।মামা ফোন করেছে,গালে একটু হাসি মেখে ফোনটা রিসিভ করলাম।ওপাশ থেকে মামা বলল,ভাগিনা তোর মা তো আজ আসে নাই ওখানে নাকি অনেক বৃষ্টি হচ্ছে তাই রওনা দেয় নাই।মামার আর কোন কথা শুনতে পাই নি মেঘের গর্জনে। আকাশের দিকে তাকালাম এক মনে, ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।চোখের পানির সাথে বৃষ্টির পানি মিশে একাকার।দূর থেকে ট্রলারের সেই মাঝি টা বলতেছিল,ও মিয়া ভাই মাছার নিচে আইসা বহেন বৃষ্টি থামলে চইলা যায়েন।

                                                    ইতি-
                                     আপনার ভালোবাসা
                                           অভাবী সন্তান

Leave a Comment

Your email address will not be published.

Scroll to Top