ছিঁড়ে প্রচুর ফুল , মালা মাটিতে ছড়িয়ে গেছে । আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল , এ বাবা ! সব ফুল মাটিতে পড়ে গেছে । কি হবে এখন ? আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন , কী আর হবে ? আমার যেমন পোড়া কপাল । এত টাকার ফুল নষ্ট হয়ে গেল ।

গল্প – ফুলওয়ালী – অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

এই পাড়াতে নতুন ভাড়া আসার পর থেকে প্রতিদিন সকালে ঘুম ভেঙে যায় এক বৃদ্ধা ফুলওয়ালীর ডাকে । সুরেলা গলা । একদম রাবীন্দ্রিক ঢঙে । সুরটা কবিগুরুর তবে কথাগুলো এই বৃদ্ধার । মিষ্টি করে বলে , ফুল চাই গো ফুল চাই , ফুল চাই গো ……? ভালোই লাগে শুনতে । এতে অবশ্য আমার একটা উপকার হয় । না , না , ফুল আমি কিনি না । সকালে বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করে না । ঘুমটা ভেঙে যায় । বাধ্য হয়ে বেরিয়ে পড়ি প্রাতঃভ্রমনে । রাস্তায় বেরিয়ে দেখি এবাড়ি ,ওবাড়ির জানলা খুলে মহিলারা এসে দাঁড়াচ্ছে । ফুলওয়ালীকে ডাকছে ‘ জয় বাংলার মা ‘ বলে । আমার জানতে খুব কৌতূহল হল । সাধারণত , একজন বৃদ্ধা মহিলাকে মাসি, পিসি , ঠাকুমা ইত্যাদি বলে ডাকাই দস্তুর । এহেন এই বৃদ্ধা কে জয় বাংলার মা বলে ডাকার একটাই কারন হতে পারে । ইনার ছেলের নাম হয়তো জয়বাংলা । এ রকম কি কারো নাম হয় ? সংশয় রয়ে গেল ।
সেদিন দেখি আমার বাড়ির সামনে উবু হয়ে বসে কি যেন করছেন জয় বাংলার মা । একটু ঝুঁকে তাকিয়ে দেখি ফুলের ব্যাগের একটা হাতল ছিঁড়ে প্রচুর ফুল , মালা মাটিতে ছড়িয়ে গেছে ।
আমার মুখ থেকে বেরিয়ে এল , এ বাবা ! সব ফুল মাটিতে পড়ে গেছে । কি হবে এখন ?
আমার দিকে না তাকিয়েই বললেন , কী আর হবে ? আমার যেমন পোড়া কপাল । এত টাকার ফুল নষ্ট হয়ে গেল ।
তাহলে কি করবেন ?
কী আর করবো , বাবা ? এ গুলো কুড়িয়ে ফেলে দিতে হবে । এই করতে গিয়ে আবার ওদিকে দেরি হয়ে যাবে ।
আমি কি আপনাকে একটু সাহায্য করবো ?
এবার আমার দিকে তাকালেন মহিলা । চোখ দুটো চিক চিক করে উঠলো ।
বললেন , না , থাক। তুমি যে বললে তাতেই আমি খুশি । জানো বাবা , আমার একটা ছেলে ছিল । বেঁচে থাকলে তোমার বয়সী হত । আজ দশ বছর হয়ে গেল সে আর নেই ।
নেই মানে ? আপনাকে ছেড়ে চলে গেছে ?
হ্যাঁ বাবা , চিরতরে চলে গেছে । সে আর বেঁচে নেই ।
মনটা খারাপ হয়ে গেল । একটু চুপ থেকে বললাম , কি ভাবে মারা গেল ?
পুলিশের গুলিতে ।
আমার মুখ দিয়ে কথা সরছে না ।
দু চোখের জল মুছে উনি বললেন , খারাপ সঙ্গে মিশেছিল । অনেক নিষেধ করেছিলাম । শোনে নি আমার কথা । আসলে উদ্বাস্তু কলোনিতো ।
সেটা কোথায় ?
বনগাঁর দিকে । এখন অবশ্য সেখানে থাকি না । রানাঘাটে থাকি ।
একটা কথা জিজ্ঞেস করবো ?
হ্যাঁ , করো ।
আপনি কি বাংলাদেশ থেকে এসেছেন ?
হ্যাঁ গো , ওটাই তো ছিল আমার দেশ । এখন অবশ্যি আমি এই দেশের লোক হয়ে গেছি ।
আমার ছেলে যে বছর জন্মালো সে বছরই বাংলাদেশ স্বাধীন হলো । জানো , সেদিনের কথা আমি কোনোদিন ভুলতে পারবো না । আমি হাসপাতালে শুয়ে । বাইরে আতশবাজির শব্দ । আনন্দে মুখরিত সারা দেশ । এ যেন এক খুশির ভূমিকম্প । সিস্টাররা রুগীদের মিষ্টি খাওয়াচ্ছে । সবাই সবাইকে ‘ জয় বাংলা ‘ বলছে । আমাকেও মিষ্টি দিল । ডাক্তার বাবু বললেন , তোমার ছেলে হয়েছে । খুব শুভ দিনে । কি নাম রাখবে ছেলের ?
আমার মুখ থেকে বেরিয়ে গেল ‘ জয় বাংলা ‘ । কিন্তু তখনো জানতাম না আমার স্বামী শহীদ হয়েছে । সেই খবর আমাকে তখন জানানো হয় নি । যখন জানলাম শিশু কোলে আমি একদম একা । কোথায় যাবো , কি করবো কিছুই জানি না । খোঁজ পেলাম অনেকেই কাজের সন্ধানে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যাচ্ছে । আমিও দেশ ছাড়লাম । উঠলাম উদ্বাস্তু কলোনিতে । শুরু হল জীবন সংগ্রাম । কিন্তু ছেলে মানুষ হল না । খারাপ সঙ্গে মিশে বিপথে চলে গেল । তারপর ….. আশ্চর্য্যের কথা কি জানো বাবা , ছেলে মরে গেছে , দেশ চলে গেছে তবু দেশের নাম আমার গায়ে রয়ে গেছে । সবাই যখন ডাকে জয় বাংলার মা বলে , গর্বে আমার বুক ফুলে ওঠে । দুঃখ একটাই সেই সুখে কালির পোচ ঢেলে দিল আমার অমানুষ ছেলে । চলি বাবা , অনেক দেরি হয়ে গেল । ভালো থেকো । মায়ের মুখ , দেশের মুখ উজ্জ্বল কোরো ।
—————

Facebook Comments Box
SHARE NOW

অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

অসীম কুমার চট্টোপাধ্যায়

>
Scroll to Top
%d bloggers like this: