স্বাধীনোত্তর বাংলা কবিতা

কবিতার রূপকল্প

কবিতার রূপকল্প : পর্ব : ২৪
( অন্তিম পর্ব)

|| স্বাধীনোত্তর বাংলা কবিতা ।|

“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

সৌম্য ঘোষ

“”””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””””

মধ্য রাত্রির পর যারা জন্মেছেন অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর । এই নতুন প্রজন্মের কবিদের কয়েকজন সংগঠিত করেছিলেন উত্তরাধুনিকতার আন্দোলন । এই কবিদের মধ্যে প্রধান অমিতাভ গুপ্ত (১৯৪৭), অঞ্জন সেন (১৯৫১) ইত্যাদি। আধুনিকবাদী অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে বাংলা কবিতায় তাঁরা পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছেন মধ্যযুগ থেকে চলে আসা আবহমান দেশজ কাব্যের ধারাকে। তাঁদের লক্ষ্য , আবহমান দেশজ কাব্যের ধারা এবং দেশীয় ঐতিহ্য আত্মস্থ হওয়া।
স্বাধীনতার কালের উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে আছেন ভাস্কর চক্রবর্তী , রনজিত দাশ (১৯৫০), সব্যসাচী দেব (১৯৪৬) , জয় গোস্বামী (১৯৫৪) । বর্তমান সময়ের আর্তি , নিরালম্ব শূন্যতা, নিদ্রাহীনতা ঘুরে ফিরে এসেছে ভাস্কর চক্রবর্তীর কবিতায় :

“ছুঁয়ে যাই ব্যর্থ এ জীবন
হে জীবন তোমাকে প্রণাম।”

শহুরে ‘রং ওঠা জীবনযাপনের’ কথা নির্মমভাবে রূপায়িত করেন রনজিত দাশ।
নকশালপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থেকেও কবি সব্যসাচী দেব সেই আন্দোলনের কাব্যাদর্শের মধ্যে
নিজেকে বেঁধে রাখেন নি । তিনি লেখেন ইতিহাসের কথা, কালো মানুষের গানের কথা, জমি থেকে উৎখাত ফুটপাতে আশ্রয় নেয়া কৃষক পরিবারের কথা, শহরের কাজের মেয়ের কথা। সমাজ সচেতন এই কবির কবিতায় উঠে আসে কর্ণ, দ্রৌপদী, বেহুলা, ফুল্লরার পুরাণকথা।

কবি সব্যসাচী দেবের বিখ্যাত কবিতা “কর্ণ ” থেকে কিছু স্তবক :

“…. অস্তমান সূর্যকে ঢেকে, আমার সামনে এসে
মাতা কুন্তী ভিক্ষা চাইলেন পঞ্চপুত্রের প্রাণ,
তাঁর চোখের মিনতি তোমারই জন্য হে অর্জুন ;
সেই মুহূর্তে জানলাম, যদি জয়ী হই সমস্তজীবন
আমাকে বহন করতে হবে অভিশাপ—আমার মাতার ;
এইবার লগ্ন এল, তৃতীয় পাণ্ডব। শেষ খেলা ;

বাজি রইল যে-কোনো জীবন, ধনুর্বাণ হাতে নাও—
এ-খেলায় পরিত্রাণ নেই কোনো, কারো নেই তোমার আমার।

আমাকে একমুহূর্তে ভিক্ষা দাও কৌন্তেয় ;
সারাশরীর ভারি হয়ে আসছে পাথরের মতো
বড়ো দীর্ঘকাল রণক্ষেত্রে আছি।
সমবেত জনতার অট্টহাসি, আচার্যের প্রত্যাখ্যান, তোমার বঙ্কিম বিদ্রুপ,
এর মাঝে তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম আমি ক্রীড়াঙ্গনে
জানতাম আমার প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ নেই ভারতভূমিতে তুমি ছাড়া ;
প্রবল স্পর্ধায় ছুঁড়ে দিয়েছিলাম দ্বন্দ্বের আহ্বান,
কিন্তু বিনা যুদ্ধে তুমি অর্জন করে নিলে শ্রেষ্ঠত্বের বরমাল্য ;

আরো একবার, কাঙ্ক্ষিতা নারীকেও তুমি জিতে নিয়েছিলে
আমার অবনত দৃষ্টির সামনে থেকে,
অসিতাঙ্গী অগ্নিকন্যা আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন
সুতপুত্রকে বরণ করার অনিচ্ছায় ;
তবু স্থির করি নি আমার পথ,
বারেবারে আমাকে মনে করিয়ে দেওয়ে হয়েছে আমি সুতপুত্র
বারেবারে আমি ভুলতে চেয়েছি সেই পরিচয় ;
অধিরথ দিয়েছিলেন স্নেহ ; সামান্যা নারী রাধা
আমাকে পূর্ণ করেছিলেন মাতৃত্বের অমৃতে
আর প্রতিমুহূর্তে সেই ভালোবাসা আস্বাদন করতে করতে
আমি ভেবেছি এখানে নয়, আমার স্থান পাণ্ডু-রাজ গৃহে ;”

জয় গোস্বামী
_______________

শব্দ ও ছন্দের অসামান্য কুশলতায় মুগ্ধ করেন জয় গোস্বামী । তাঁর হাতে আছে ” জাদুপিদ্দিম” ।
আঙ্গিক ব্যবহারে তিনি যেমন দক্ষ, তেমনি হার্দ্য আন্তরিকতা তাঁর কবিতায়।
“রেখেছি নরম করে পাথরের খরস্রোতা ফুল
এর কোনো অর্থ নেই।”
তার কবিতায় গোড়ার দিকে অর্থের চেয়েও বড় হয়ে উঠতো কল্পজগত । পরবর্তী কালে তিনি সেই কল্পজগত থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়েছিলেন।
“ঘুমায় আমার শব
আমি যাই জলে ।”
জয় গোস্বামীর কবিতা এসেছে নিসর্গের সঙ্গে একাত্মতা, জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা । তিনি লেখেন মেঘবালিকার কথা, দাম্পত্য জীবনের বিবাহ বিচ্ছিন্নার বেদনার কথা , কুলত্যাগিনী, কিশোরী মেয়ের প্রেমে পড়া, রিক্সাওয়ালার প্রতি প্রেমে কাজের মেয়ের মুক্তির কথা । তিনি প্রার্থনা করেন:

“আমাদের শুকনো ভাতে লবণের ব্যবস্থা হোক।”

 বাংলা ভাষার উত্তর জীবনানন্দ পর্বের অন্যতম জনপ্রিয় কবি হিসাবে পরিগণিত। তাঁর কবিতা চমৎকার চিত্রকল্পে, উপমা এবং উৎপ্রেক্ষায় ঋদ্ধ। তিনি দুবার আনন্দ পুরস্কার লাভ করেছেন। “বজ্র বিদ্যুৎ ভর্ত্তি খাতা” কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি পশ্চিমবাংলার আকাডেমী পুরস্কার অর্জন করেন। তাঁর কবিতার একটি বিখ্যাত পংক্তি:

‘‘অতল তোমার সাক্ষাৎ পেয়ে চিনতে পারিনি বলে / হৃদি ভেসে গেল অলকানন্দা জলে’’’।

মোটামুটি ভাবে বলা যায়, পঞ্চাশ দশক থেকেই বাংলা কবিতার নব্য আধুনিকতার সূত্রপাত । তখন থেকেই শুরু হয়েছিল স্বাবলম্বী বাংলা কবিতার যাত্রা । সেই যাত্রা, দেশে যে ঐতিহ্যকে স্বীকার করে, পশ্চিমী আদর্শের বালাই না রেখে, পুরোপুরি শুরু হয় সত্তর দশক থেকে । এই কবিতার ক্ষেত্রে রবীন্দ্র অনুসারী , রবীন্দ্র প্রভাবিত, রবীন্দ্র পরবর্তী, জীবনানন্দ প্রভাবিত, আধুনিক বা অতি আধুনিক বা আন্দোলনমুখী ——– এমন কোন বিশেষণ নেই এনাদের ক্ষেত্রে।

এনারা একেবারেই আত্মনির্ভর এবং স্বচ্ছ ভাবধারার । এখন যা লেখা হচ্ছে, কলকাতা বা মফঃস্বলের, ছোট-বড় সব পত্রিকায় , তা একেবারেই বাংলা কবিতা । এইসব কবির কবিতায় দেশজ জীবন , মানুষের বিচিত্র অভিজ্ঞতার উপলব্ধি , বেদনার বার্তা , নৈসর্গিক চরাচর, সংবেদনশীল পদাবলীতে স্থায়িত্ব পায়।

স্বল্প পরিসরে, সকল কবির নাম উল্লেখ করা সম্ভব নয় , এই জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী । এই সময়ের উল্লেখযোগ্য কবিদের মধ্যে অগ্রগণ্য ———-
শামসের আনোয়ার, সুব্রত রুদ্র, দেবারতি মিত্র, কৃষ্ণা বসু, পার্থপ্রতিম কাঞ্জিলাল, নিশীথ ভড় , বীতশোক ভট্টাচার্য, একরাম আলী, প্রমোদ বসু, নির্মল হালদার, গৌতম বসু, ব্রত চক্রবর্তী ।

আর্থিক দিক দিয়ে উন্নত, প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত দেশগুলিতে কবিতার মৃত্যুর পরোয়ানা অনেক আগেই জারি হয়ে গেছে। আমাদের দেশেও পণ্য সভ্যতা মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে ভোগ, আরো ভোগের মসৃণ রেশমি সুখের অভিমুখে । এখন সঞ্চার ইন্টারনেটে , ই-মেলে , ফেসবুকে, হোয়াটসঅ্যাপে । বাংলা কবিতা তো বটেই, বাংলা ভাষাও এখন আক্রান্ত । তবুও এই দেশ, গরিব অনগ্রসর দেশ বলেই হয়তো, এখনো কবিতা বেঁচে আছে । এখনো আমরা মুগ্ধ কবিতা পাই , যাদের কবিতা থেকে ———

মৃদুল দাশগুপ্ত, সুবোধ সরকার, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় , অনুরাধা মহাপাত্র, অঞ্জলি দাশ , জয়দেব বসু, সুতপা সেনগুপ্ত, রুপা দাশগুপ্ত , মল্লিকা সেনগুপ্ত , জহর সেন মজুমদার এবং আরো আরো আরো অনেকে কাছ থেকে ।

এমন কিছু কবিতার স্তবক আপনাদের কাছে রাখছি :::

(১) “আগুনের একেবারে মাঝখানে এসে দাঁড়ালে
আর আগুন লাগে না।
আগে আশেপাশে থাকতুম ।
হাত পুড়ে যাবে, মুখ পুড়ে যাবে, বুক পুড়ে যাবে
সর্বদা ভয় ছিল।
এখন এসে দাঁড়িয়েছি আগুনের একেবারে
মাঝখানে ।” ( ব্রত চক্রবর্তী )

(২) “এভাবে ফুরোতে থাকে আমাদের স্বপ্নের সবুজ
এভাবেই বাতাসের গায়ে জমে ওঠে
আমাদের গল্পগুচ্ছ
শূন্যের ভিতর এই ঘর ও সংসার,
ছায়াহীন দেহে দীর্ঘ—
দীর্ঘ জিভ , এখন জিনের মতো আমাদেরও
উল্টো দিকে পা ।” ( অঞ্জলি দাশ )
(৩) “উন্মুক্ত স্তনের উপর এসব আমি কী
লিখেছিলাম ?
হে অলৌকিক কাঞ্চনবলয় ,
তোমাকে বারবার আমি উন্মুক্ত পাবো না।”
( সুবোধ সরকার )
(৪) ” ঘাস মাটি বায়ু জল এতদিন পুরুষের ছিল
সমাজ পুরুষ ছিল, এইবার উভলিঙ্গ হোক ।”
( মল্লিকা সেনগুপ্ত )
(৫) “আমাদের এই দেহগুলির ভেতর থেকে
বার হয়ে আসছে অজস্র শালিক অজস্র চড়ুই
তারাই এই বাংলার আসল কবি,
ঘুরে ঘুরে তৃপ্ত, ঘুরে ঘুরে অতৃপ্ত,
একদিন তারাই আমাদের নিয়ে

লিখে রেখে যাবে পৃথিবীর আসল কবিতা ‌।”
( জহর সেন মজুমদার )

এই দীর্ঘ প্রবন্ধ “কবিতার রূপকল্প”

শেষ অংশে এসে, দাবি করতে পারি, বাংলা ভাষায় লেখা হচ্ছে পৃথিবীর আসল কিছু কবিতা। হাজার বছর আগে মেঘে , মেদুর আকাশের নিচে , খরস্রোতা নদীর তীরে, রাজসভায় বা পর্ণকুটিরে, শষ্য সবুজ বাংলার মাটিতে , শুরু হয়েছিল বাংলা কবিতার উচ্চারণ , সেই উচ্চারণ আজও শত শত কন্ঠে মুখর । কবিতা লেখা হচ্ছে বাংলাদেশের গ্ৰামে- গঞ্জে , ঢাকা, বাংলাদেশের বিভিন্ন শহরে-প্রান্তরে , কলকাতায় , কলকাতার বাইরে মফস্বল বাংলায় , পুরুলিয়া, হলদিয়া , জঙ্গিপুর, কাকদ্বীপ, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, হাওড়া, হুগলি ,মেদিনীপুর ,দিনাজপুর, বাঁকুড়া । কোথায় না ?

বাংলা ভাষার ঐতিহ্যকে মান্য করে হাজার বছরের পুরনো বাংলা কবিতা নিত্য নবীনতা দীপ্ত ও উজ্জ্বল ।।

# গ্রন্থঋণ এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ::
——————————————-

এই প্রবন্ধের বিষয়ে আমার কোন মৌলিকতার দাবি নেই। এই প্রবন্ধ লিখতে গিয়ে আমি দীনেশচন্দ্র সেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে বাংলা সাহিত্যের বহু ঐতিহাসিকদের শরণাপন্ন হয়েছি । বিভিন্ন বই- পত্রপত্রিকা, গুগুল ,

উইকিপিডিয়া , আনন্দবাজার পত্রিকা থেকে প্রয়োজন মত ব্যবহার করেছি । কখনো নিজের পুরোনো লেখাও ব্যবহার করেছি । যেহেতু এই প্রবন্ধটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাপত্র নয় , বিশেষজ্ঞদের জন্য নয় ; কবিতা অনুরাগী সাধারণ পাঠকদের জন্য লেখা , তাই উৎস নির্দেশের প্রয়োজন বোধ করিনি ।

_______ অধ্যাপক সৌম্য ঘোষ। চুঁচুড়া। হুগলী ।

Facebook Comments Box
SHARE NOW

কবিতার রূপকল্প পর্ব _ ২৪

Soumya Ghosh

>
Scroll to Top
%d bloggers like this: