রক্তজবার গল্প

#ছোট গল্প

রক্তজবার গল্প

অমিতাভ মুখোপাধ্যায়

সংসারের বাগানে ফুল হয়ে সে ফুটে থাকতে চেয়েছিলো. কিশোরী বেলা থেকেই জবা ছিল সহজ, সরল. দর্শন শাস্ত্রে অনার্স নিয়ে গ্রাজুয়েট হবার পরই বিয়ে হয়ে গেল এক ব্যাংক কর্মীর সঙ্গে. কয়েক বছর পর পুত্র সন্তান হিমাদ্রি এলো.স্বামী, শাশুড়ী, মেজোজাকে নিয়ে যৌথ সংসারে অনাবিল সুখ, আর্থিক স্বাছন্দ্য , পরউপকারী মনোভাবের জন্য সকলের কাছেই প্রিয় ছিল সে. স্বামী সুপ্রিয়ও তার এই মানসিকতার জন্য কোনওদিন আপত্তি করে নি.
বেশ কাটছিলো তাদের নানা রঙের দিনগুলি.

সুপ্রিয় অফিসার হয়ে উত্তরবঙ্গে বদলি হয়ে যাওয়ায় পর শাশুড়ির পরামর্শে জবাও শিশু পুত্র হিমাদ্রিকে নিয়ে সেখানে চলে গেল. তখন ল্যান্ড ফোন ছিল দুর্লভ. চিঠিই ছিল একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম. হিমাদ্রি ভর্তি হলো স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে.
কিন্তু একবছরের মধ্যেই সেই সুখের সংসারে ছন্দপতন ঘটে গেল . সুপ্রিয় স্কুটারে করে ব্যাংকে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় পড়লো. ব্যাংক ম্যানেজার নিজ দায়িত্বে প্রথমে সরকারি হাসপাতাল, অবস্থার অবনতি দেখে শিলিগুড়ির সেবক রোডে এক নামী বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে দিলেন. বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা পরীক্ষা করে জানিয়ে দিলেন, ‘ হেড ইনজুরি হয়েছে. এখনই অপারেশন করতে হবে.’ জবাকে কোনও কথা ইচ্ছে করেই জানালো হলো না. সে তখন অন্তঃসত্ত্বা জবার দাদা বিনয়ের কাছে থানা মারফত এই দুঃসংবাদটি পৌঁছে গেল. সদ্য বিবাহিত বিনয়ের আর হানিমুনে যাওয়া হলো না. ছোট জামাই খবর পাওয়া মাত্র ইসলাম পুরে রওনা হয়ে গেল. বিনয় মাকে জানালো, সুপ্রিয় একটা ছোটখাটো দুর্ঘটনায় পড়েছে. ভালো আছে. তবে তাকে আজ রাতের ট্রেন ধরতে হবে. সুপ্রিয়র দাদাও সঙ্গে যাচ্ছে. তুমি দুদিন পরে যাবে, সরমা তো আছেই .সরমাকে আসল সত্য টি বিনয় জানিয়ে দিল.
বিনয় ইসলামপুরে পৌঁছে প্রথমেই ব্যাংক ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করলো. উনি জানালেন, অপারেশন সফল. সাত দিন পর ডিসচার্জ করে দেবে. খরচ খরচা ব্যাংকই বহন করবে আমরা দার্জিলিং মেলে আপনাদের ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দোবো. সুস্থ হলে আপনাদের এলাকার ব্যাংকের শাখায় সুপ্রিয়কে পোস্টিং দেওয়া হবে.হেড অফিস তাই জানিয়েছে. বিনয় ব্যাংক ম্যানেজার, অফিসার ও অন্যান্য কর্মীদের বার বার ধন্যবাদ জানালো.
সুপ্রিয় এখন প্রায় সুস্থ.শুধু ফিজিও থেরাপির প্রয়োজন.
বিনয় ডিসচার্জ সার্টিফিকেট, ব্যাংকের চিঠি সহ সকলকে নিয়ে ট্রেন ধরলো.শিয়ালদহে নেমে সুপ্রিয়র দাদা জানালো, ভাইকে একবালপুরের এক নামী বেসরকারি হাসপাতালে ব্যাংকের দায়িত্বে একবার চেকআপ করিয়ে নিতে চান .বিনয়ও সম্মতি দিল. সুপ্রিয়’র আর বাড়ি ফেরা হলো না. বিনয় বোন, পুত্র হিমাদ্রি, সদ্য জাত কন্যা সন্তানকে নিয়ে নিজেদের বাড়িতেই উঠলো. অসুস্থ শাশুড়িকে সব জানানো হলো.
এর পর জবার জীবনে যা যা ঘটলো তা কল্পনার অতীত.
একবালপুরের সেই সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে যথাযথ চিকিৎসা হলো না. সুপ্রিয়র বেডসোর হয়ে গেল. এক মানবিক নার্স জবাকে জানালো অন্যত্র নিয়ে চলে যান.
সুপ্রিয়র দুশ্চিন্তা বেড়ে গেল. এক নিকট আত্মীয়ার চেষ্টায় অন্যত্র ভর্তি করা হলো. সেখানকার ডাক্তারবাবুরা মেডিকেল বোর্ড বসিয়ে জানিয়ে দিলেন হেডইনজুরি জনিত বিপদ কেটে গেলেও উনি জীবনীশক্তি হারিয়েছেন. একবালপুরে কার্যকরী চিকিৎসা হয় নি. আমাদের আর কিছুই করার নেই. ঈশ্বরকে ডাকুন. উনার স্ত্রীকে নিয়ে আসুন. ছেলে মেয়েদের দেখান. যদি উনি মানসিক শক্তি ফিরে পান—–
জবা ঈশ্বরের পায়ে লুটিয়ে পড়লেও সেই বছর নীল ষষ্টির দিন সুপ্রিয় মাত্র একচল্লিশ বছর বয়সে সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেল.

মাত্র একত্রিশ বছর বয়সে জবার সিঁথির সিঁদুর মুছে গেলো . সদা হাস্যময় এক জীবন যাত্রায় যতিচিহ্ন পড়ে গেল.জবা অসুস্থ হয়ে পড়লো. মাইগ্রেন, হাই প্রেসার এসে গেল. এই সময় বিনয়ের স্ত্রী সরমার ভূমিকা ছিল সহোদর বোনের মতো. জবার নার্সিং, দুটি শিশুকে দেখা, হিমাদ্রিকে হাই স্কুলে ভর্তির উপযুক্ত করার সব দায়িত্ব বিনা দ্বিধায় নিজের কাঁধে তুলে নিলো.

বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সরমার কোলে এলো পুত্র সন্তান রোহিত. আশ্চর্য্যজনক ভাবে সেই ছেলের মুখ দেখে, কাছে নিয়ে জবা আবার উঠে বসলো.
ইতিমধ্যে ব্যাংক থেকে জবার কাজে যোগ দেবার চিঠিও এসে গেল. ডাক্তার বাবু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজে যোগ দিতে বললেন. হিমাদ্রি হাইস্কুলে ভর্তিও হয়ে গেল.

কিন্তু জীবন কোন সরল রেখা ধরে চলে না. নিজের বাড়ি হলো, দেখতে দেখতে ছেলে মেয়েরা স্কুল, কলেজের গন্ডি পেরিয়ে গেল. হিমাদ্রি চাকরির পরীক্ষা দেওয়া শুরু করলো.

মাঝে একটা অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে গেল. বিনয়ের মাও হঠাৎ সিভিয়ার হার্টএটাকে এক শীতের রাতে চলে গেলেন.

কয়েক বছর পর সব চিন্তা ভাবনা করে
এক সুপাত্রের সঙ্গে জবা মেয়ে মালতীর বিয়েও দিয়ে দিল.
কিন্তু এই আপাত সুখের সময়ও বেশী দিন স্থায়ী হলো না. মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে জবা অসুস্থ হয়ে পড়লো. পরীক্ষা -নিরীক্ষার পর ধরা পড়লো মেটাস্টেটিক কার্সিনোমা. কলকাতার টাটা মেডিকেল সেন্টারে কয়েক মাসের অতিথি হলো. মাত্র দুটি কেমো নিতে পেরেছিলো. হিতে বিপরীত হলো. ডাক্তার বাবুরা জবাব দিলেন. সকলে পরামর্শ করে তাকে নিজের বাড়িতেই নিয়ে আসা হলো. ভালো রবীন্দ্র সংগীত গাইতো সে , গানের একটা ক্যাসেটও বার করে ছিল. সেই সুরও একসময় চলে গেল. একদিন বিনয়কে জবা জিজ্ঞাসাও করে ছিল,’ দাদা আমার কী হয়েছে? ‘
বিনয় শুধু বলেছিলো, ‘ভালো হয়ে যাবি, আমরা তো সকলেই পাশে আছি ‘.
যে একদিন সংসারের সাজানো বাগানে রক্তজবার মতো ফুটে থাকতে চেয়ে ছিল তা আর হলো না.
শেষেএক ভোর বেলায় তার শ্বাস কষ্ট শুরু হলো. মুখ দিয়ে রক্ত উঠতে শুরু করলো. বিনয়কে দেখে বললো ‘দাদা আমি আর বাঁচবো না, তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে চলো. ‘
ছোট বোন আলো , হিমাদ্রি, রোহিত প্রথমে জবাকে গ্রামীণ পরে ডিস্ট্রিক হাসপাতালে নিয়ে গিয়েও ভর্তিও করে ছিল কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না.কয়েক ঘন্টার মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল——
মেয়ে মালতী মায়ের মৃতদেহর সামনে দাঁড়িয়ে বললো, ‘এতো তাড়াতাড়ি চলে গেলে মা.’

ভাঙা গড়া জীবনেরই নিয়ম. কিন্তু এ কেমন জীবন যেখানে জোয়ারের থেকে ভাঁটাই বেশী.সুখের থেকে দুঃখই বেশী. এতো ঈশ্বর ভক্তি, এতো পর উপকারের কোন মূল্যই সে এজীবনে পেলো না.

মাত্র ছাপান্ন বছরে, নিয়তি নির্দিষ্ট পথে তার জীবনের সমাপ্তি ঘটে গেল.


Facebook Comments Box
SHARE NOW

FB_IMG_1582637528398.jpg

AMITAVA MUKHOPADHYAY

>
Scroll to Top
%d bloggers like this: